প্রকাশিত: Mon, Feb 6, 2023 2:40 PM
আপডেট: Mon, Jan 26, 2026 11:03 AM

ষাটের দশকে দিনাজপুর থেকে ঢাকা হেলিকপ্টার সার্ভিস ছিলো!

বিউটিফুল দিনাজপুর : যে সময় সড়ক যোগাযোগও তেমন একটা ছিলো না, রেলপথ ছিলো ব্রিটিশ আমলের, তাতে লক্কর-ঝক্কর রেলগাড়ি ছুটতো, দেশজুড়ে বিমানবন্দরই ছিলো সাকুল্যে চারটিÑ সে সময় হেলিকপ্টারের এমন রমরমা অবাক হওয়ার মতো।  হেলিকপ্টারের পাখার শব্দে কান ঝাঁঝা করে। তবু গ্রামের নানাবয়সী মানুষ ভিড় করেছে হেলিপ্যাডে। ফাঁকা মাঠে হেলিপ্যাড। সেটিকে ঘিরে একটা জটলা। এ সুযোগ কাজে লাগিয়েছে ফেরিওয়ালার দল। বাদাম, চানাচুরসহ মনোহারি সব খাবার বিক্রি হচ্ছে। খোলা মাঠে যেন মেলা বসে গেছে। হেলিকপ্টারের পাখার ঘুর্ণি বাতাসে উড়ে যাচ্ছে দর্শনার্থীদের ছাতা। উড়ছে মাথার চুল।

১৯৬২ সালে পিআইএ যুক্তরাষ্ট্র থেকে কিনে আনে তিনটি ব্র্যান্ড নিউ সিকোরস্কি এস-সিক্সওয়ান হেলিকপ্টার। মাত্র এক বছর আগে হেলিকপ্টারের এই মডেলটি বাণিজ্যিক ব্যবহারের অনুমতি পায়। বড় আকৃতির এ হেলিকপ্টারে আসন সংখ্যা ছিলো ২৫টি। দুই পাইলট সহ ক্রু ছিলেন চারজন।

ঢাকা থেকে পার্বতীপুর, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, চাঁদপুর, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, খুলনা, চালনা বরিশাল, হাতিয়া, সন্দ্বীপ, চট্টগ্রাম, রংপুর, রাজশাহী, পাবনা, সিলেট, শমশেরনগর, হবিগঞ্জ, ভৈরব, কুমিল্লা, যশোর, ভোলা, রাঙ্গামাটি, কক্সবাজারেও চলতো হেলিকপ্টার। বলতে কী এটিকে বলা হতো বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক হেলিকপ্টার সেবা। অন্তত তখনকার এভিয়েশন বিষয়ক ম্যাগাজিনগুলোর বিজ্ঞাপনে সেরকমই দাবি করতে দেখা যায়। এ দাবি কতটা সঠিক ছিল, নিশ্চিত করা কঠিন। তবে উপমহাদেশে আর কোথাও এরকম হেলিকপ্টার সেবা ছিল না। এমনকি পূর্ব পাকিস্তানে এ সেবা চালু করা হলেও এরকম কোনো সেবা পশ্চিম পাকিস্তানে চলেনি।

ছোটবেলায় এই হেলিকপ্টারে ওঠার বর্ণনা পাওয়া যায় নবী এন মাহমুদ নামে একজন ফেসবুকে তিনি লিখেছেন, ‘এই ভ্রমণ খুবই উপভোগ্য ছিলো। হেলিকপ্টারগুলো খুব নীচে দিয়ে উড়ে যেত। জানালা দিয়ে নিচে গাছ-পালা ঘর-বাড়ি এমনকি মানুষ পশু-পাখি পর্যন্ত স্পষ্ট দেখা যেত। পথ-ঘাট মাঠ নদী সব দৃশ্য অতুলনীয় মনে হতো। ভ্রমণের সময় ইচ্ছামতো চকলেট নেয়া যেতো’। প্রশ্ন হলো, যে সেবার এতো রমরমা, সেটা কোথায় হারিয়ে গেল? কেন? কী করে সেটা সবার স্মৃতি থেকে মুছে গেলো? কারও স্মৃতিতে এটা না থাকার কারণ এ সেবা খুব বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। মাত্র তিন বছর। যেভাবে হুট করে সেটা শুরু হয়েছিল, হুট করেই সেটা বন্ধ হয়ে গেছে। রাতারাতি। আর এর জন্য দায়ী একটি দুর্ঘটনা। সেই দুর্ঘটনা ছিল ভয়াবহ। ১৯৬৬ সালের দোসরা ফেব্রুয়ারি ঢাকা থেকে ফরিদপুরের উদ্দেশে উড়াল দেয় সেই তিন হেলিকপ্টারের একটি। তিন ক্রুসহ ২৪ আরোহী ছিল তাতে। গন্তব্য থেকে মাত্র দুই মিনিটের দূরত্বে সেটি বিধ্বস্ত হয়। এতে থাকা ২৪ আরোহীর ২৩ জনেরই মৃত্যু হয়, ঘটনাস্থলে। বেঁচে যান মাত্র একজন।

কেন বিধ্বস্ত হয়েছিল হেলিকপ্টারটি? তখনকার পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন বা পিআইএ-এর প্রেসিডেন্ট এয়ার মার্শাল আসগর খান বলেছিলেন, হেলিকপ্টারটির পেছনের অংশ এবং মূল পাখায় শকুনের ধাক্কা লেগেছিল। পরদিন তেসরা ফেব্রুয়ারি দৈনিক ইত্তেফাকের আট কলাম জুড়ে প্রধান সংবাদ ছিল এই দুর্ঘটনাটি। সেই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে: ফরিদপুরে হেলিকপ্টার দুর্ঘটনার অব্যহিত পর ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর ইত্তেফাকের নিজস্ব সংবাদদাতা টেলিফোনযোগে জানান যে, একটি উড়ন্ত শকুনের সহিত সংঘর্ষই যে ফরিদপুরের অদূরে হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হওয়ার কারণ, সে সম্পর্কে কাহারও মনে আর সংশয় থাকিতে পারে না। হেলিপোর্টের তিন মাইল দক্ষিণ-পূর্বের তুলাগ্রামে যখন অগ্নি প্রজ্বলিত অবস্থায় হেলিকপ্টারটি মাটিতে পড়িয়া বিধ্বস্ত হইতেছে, তাহার কয়েক সেকেন্ড পূর্বে বায়তুল আমানের টেকনিক্যাল স্কুল প্রাঙ্গণে ক্রীড়ারত ছাত্র আবদুর রাজ্জাক ও তাহার সঙ্গীরা আকাশ হইতে একরাশ পাখীর পালক ঝরিয়া পড়িতে দেখে ও পরক্ষণেই একটি দ্বিখণ্ডিত শকুন আসিয়া ধপাস করিয়া তাহাদের সামনে পড়ে। এ ঘটনা হইতে কাহারও আর বুঝিতে বাকী থাকে না যে, শকুনের সহিত সংঘর্ষের ফলেই হেলিকপ্টারটি বিধ্বস্ত হয়।

এই দুর্ঘটনা ১০ মাস পর আরেকটি দুর্ঘটনা ঘটে। ১০ ডিসেম্বর রাজধানীর অদূরে রূপপুর এলাকায় বিধ্বস্ত হয় দ্বিতীয় একটি হেলিকপ্টার। প্রাণ হারান পাইলট সৈয়দ হাবিবুল হাসান। আরেক পাইলট আহত হলেও প্রাণে বেঁচে যান। হাবিবুল হাসান একই সাথে এই হেলিকপ্টার সার্ভিসের চিফ পাইলট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছিলেন। পরদিন ১১ ডিসেম্বর দৈনিক আজাদির প্রধান খবর ছিল এই হেলিকপ্টার দুর্ঘটনা।

আগেই বলা হয়েছে, সে সময় পিআইয়ের কাছে এ ধরনের হেলিকপ্টার ছিল মাত্র তিনটি। যার একটি ফেব্রুয়ারিতে, আরেকটি বিধ্বস্ত হয় ডিসেম্বরে। ফলে তাদের বহরে অবশিষ্ট থাকে আর মাত্র একটি হেলিকপ্টার। এ ঘটনার পর সাময়িকভাবে এই হেলিকপ্টার সেবা বন্ধ করে দেয় পিআইএ। পরে আর কখনই সেটি চালু করা যায় নি। এভাবেই বন্ধ হয়ে যায় বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক হেলিকপ্টার সার্ভিস। অক্ষত থাকা শেষ হেলিকপ্টারটি ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের কাছে বিক্রি করে দেয় পিআইএ।