প্রকাশিত: Mon, Mar 27, 2023 2:39 PM
আপডেট: Mon, Jan 26, 2026 5:03 PM

অফিস-আদালত কিংবা যত্রতত্র যাকে ইচ্ছে তাকে ভাই, মামা, চাচা, খালা কিংবা আপা ডাকা ঠিক নয়

অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন : প্রত্যেক ভাষার প্রতিটি শব্দের একটা মেন্টাল ইমেজ আছে। বাংলা ভাষার প্রতিটি শব্দের মেন্টাল ইমেজ আমাদের ছোটবেলাতেই গ্রথিত বা ব্রেইনের  ভেতরে এমনভাবে গেঁথে যায় যে কেউ ওই শব্দটি বলা মাত্রই শব্দের সেই ইমেজ ব্রেইনে মুভির মতো ভেসে উঠে। সেই জন্যই ‘মাফ করবেন’ বলা আর ‘এক্সকিউজ মি’ বলা আমাদের কাছে একরকম না। ‘মাফ করবেন’ এর অর্থ আমাদের ব্রেইনে যত গভীরভাবে আছে ‘এক্সকিউজ মি’ এর অর্থ তত গভীর না। তাই আমরা অনায়াসে ‘এক্সকিউজ মি’ বলতে পারি, কিন্তু ‘মাফ করবেন’ বলতে কষ্ট হয়। তেমনি ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’ এর অর্থ আমাদের কাছে যতটা গভীর ‘আই লাভ ইউ’ এর অর্থ ততটা গভীর না। শব্দের মেন্টাল ইমেজ ছোটবেলাতেই গ্রথিত হয় বলেই শিক্ষা মাতৃভাষায় হওয়া উচিত। পৃথিবীতে যেইসব দেশ উন্নত হয়েছে তারা কেবল মাতৃভাষাতে পড়েই উন্নত হয়েছে। এর কোনো ব্যতিক্রম নেই।

 ২০০ বছরের ব্রিটিশ শাসন ‘স্যার’ শব্দের একটা মেন্টাল ইমেজ তৈরি করে দিয়ে গিয়েছে। ‘স্যার’ শব্দের এমন একটা মেন্টাল ইমেজ আমাদের মধ্যে গ্রথিত হয়েছে যে যাকে স্যার বলা হয় সে নিজেকে মালিক বা প্রভু মনে করে আর যে ডাকলো সে যেন প্রজা বা ভৃত্য। সেই জন্যই আমাদের ড্রাইভাররা আমাদের স্যার ডাকে। আমাদের ড্রাইভার স্যার ব্যতীত অন্য কিছু ডাকবেন এবং তা মেনে নিবেন এমন একজনও বাংলাদেশে খুঁজে পাওয়া যাবে না। শুধু ড্রাইভার কেন? অফিসের অধঃস্তন কর্মকর্তা কিংবা কর্মচারীও স্যার ব্যতীত অন্য কোনোভাবে সম্বোধন করলে অনেকেই মানবেন না। মূল সমস্যা হলো ‘স্যার’ শব্দের মেন্টাল ইমেজ। 

আমাদের সরকারি কর্মকর্তারা নিজেদের প্রভুই ভাবেন এবং সাধারণ মানুষকে প্রজা মনে করেন যদিও বলা হয় জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস। আসলে কেবল নির্বাচনের সময়ই এই কথা সত্য। নির্বাচনের সঙ্গে সঙ্গেই এর অর্থ উল্টে যায়। আমাদের প্রত্যেকেরই একটা নাম আছে। সেই নামকে আমরা ভালোবাসি। নাম ধরে ডাকলে তো সমস্যা নেই। নামের প্রথম অংশ ধরে ডাকা একটা প্রিভিলেজ। তাই নামের প্রথম অংশ দিয়ে ডাকে আমার প্রিয়জনেরা যেমন আমার বাবা, মা, স্ত্রী, নিকট আত্মীয়রা, ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা। এ ছাড়া বাকিরা আমার নামের প্রথম অংশ দ্বারা তারাই ডাকবে যাদের আমি পারমিশন দেবো। বাকিরা আমাকে ড. হাসান, প্রফেসর হাসান ডাকতে পারে। আমাদের সংস্কৃতির কারণে অনেকেই ভাই বলে ডাকতে পারে। কিন্তু আমি মনে করি তার জন্যও পারমিশন লাগা উচিত। ভাই ডাকাটাও একটা প্রিভিলেজ। যে কেউ যখন তখন রাস্তাঘাটে ভাই বা মামা ডাকা একদম উচিত না। তার জন্য বাংলা ভাষায় একটি শব্দ নির্দিষ্ট করে দেওয়া আছে। 

সেটি হলো ‘জনাব’। আমরা এটি কেন ব্যবহার করি না? একদম অচেনা কেউ যদি হয় যিনি আমার নাম জানেন না কিংবা আমার পদবি অথবা ডিগ্রি জানা নেই তিনি ‘জনাব’ ডাকতে পারে। অফিস আদালতে কিংবা যত্রতত্র যাকে ইচ্ছে তাকে ভাই, মামা, চাচা, খালা কিংবা আপা ডাকা ঠিক না। রাষ্ট্রীয়ভাবে আমাদের একটা বিধিবিধান নির্দিষ্ট করে দেওয়ার সময় এসেছে। দুইদিন পরপর ডাকা নিয়ে ঝামেলা আর ভালো লাগছে না। এইটার আশু সমাধান দরকার। এইটা সরকার প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে না করে বাংলা একডেমি করলে আমার মনে হয় ভালো হবে।

 লেখক: শিক্ষক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়