প্রকাশিত: Thu, Apr 27, 2023 10:43 AM
আপডেট: Mon, Jan 26, 2026 11:02 AM

ইংরেজি আছে বিদেশি শব্দে মূর্ধন্য-ণ পরিহার, একটি ভ্রান্ত বানান-বিধি

মাসুদ রানা : বঙ্গ দেশের পণ্ডিতেরা রায় দিয়েছেন যে, বিদেশী শব্দের বানানে মূর্ধন্য-ণ ব্যবহার করা যাবে না, দন্ত্য-ন ব্যবহার করতে হবে। তাদের এই নির্দেশ সাক্ষর বাঙালিরা বিনা বাক্যে পালন করছেন, কিন্তু আমি তা মানতে অস্বীকার করছি। এটি আমার স্পর্ধা নয়, বরং বাংলার স্বার্থে সবিনয় জিজ্ঞেস করছি, মহাশয়গণ, মূর্ধন্য-ণ ও দন্ত্য-ন ধ্বনির মধ্যে পার্থক্য কী এবং কেনো এই পার্থক্য বিদেশী শব্দের বানানে মানা হবে না? কী দোষ করেছে বিদেশী শব্দ?

মূর্ধন্য-ণ ধ্বনিটির উচ্চারণ স্থান মূর্ধা বা তালু। জিভের ডগা দিয়ে মূর্ধা বা তালু স্পর্শ করে এটি উচ্চারণ করতে হয় বলে এর নাম মূর্ধন্য-ণ। অন্যদিকে, জিভের ডগা দিয়ে উপরের পাটির সম্মুখের দাঁতের পশ্চাৎ স্পর্শ করে দন্ত্য-ন উচ্চারণ করতে হয়। মূর্ধন্য-ণ ও দন্ত্য-ন বর্ণ দু’টো দু’টো ভিন্ন ভিন্ন বর্গের অন্তর্গত। মূর্ধন্য-ণ অন্তর্গত ট-বর্গের, এবং দন্ত্য-ন হচ্ছে ত-বর্গের, ট-ঠ-ড-ঢ-ণ/ত-থ-দ-ধ-ন, এই বর্গ-বিন্যাসের উচ্চারণগত প্রায়োগিক অর্থ আছে। কী সেটি? আমি যেভাবে বুঝেছি এবং আমার শিক্ষার্থী ও অনুসারীদের বুঝিয়েছে, তা নীচে ব্যাখ্যা করছি। ট-ঠ-ড-ঢ ধ্বনির আগে নাসিক্য ধ্বনি সংযুক্ত করতে হলে আপনাকে অবশ্যই জিভের ডগা দিয়ে মূর্ধা বা তালু স্পর্শ করে শব্দ উচ্চারণ করতে হবে। এই নিয়মের অন্যথা করা কোনো মানুষের পক্ষে শারীরিকভাবেই সম্ভব নয়। দেখুন উচ্চারণ করে নীচের শব্দগুলো,

বণ্টন (বন্টন নয়), লণ্ঠন (লন্টন নয়), ঠাণ্ডা (ঠান্ডা নয়), ঢুণ্ঢন (দুঃখিত, কম্পিউটার ন+ঢ যুক্তই হয় না, তবে এটি যুক্তি হিসেবে আমি ব্যবহার করছি না)। আশাকরি ইতোমধ্যে আপনি চেষ্টা করে দেখেছেন যে, উপরের শব্দগুলো উচ্চারণ করতে আপনার জিভের ডগাকে মূর্ধা বা তালু স্পর্শ করতেই হবে। তাই, আপনার বানানে মূর্ধন্য-ণ লাগবেই। এবার নীচের শব্দগুলো উচ্চারণ করে দেখুন এবং বুঝুন যে, এগুলোর উচ্চারণে আপনার জিভ অগ্রভাগ কোথায় স্পর্শ করে, দন্ত (দণ্তনয়)/পন্থ (পণ্থনয়)/নন্দ (নণ্দ নয়)/অন্ধ (অণ্ধনয়), বুঝতেই পারছেন, উপরের শব্দগুলো উচ্চারণ করতে আপনাকে আপনার জিভ অগ্রভাগ দিয়ে উপরের পাটির সম্মুখের দন্ত বা দাঁতের পশ্চাৎ স্পর্শ করতে হবে। অর্থাৎ, আপনাকে দন্ত্য-ন দিয়েই শব্দগুলোর বানান লিখতে হবে। আমি যদি উপরের যুক্তি ও প্রমাণ দিয়ে আপনাকে কনভিন্স করে থাকি যে, আমাদের প্রাচীন ধ্বনিবিজ্ঞানীরা বুঝেশুনেই ণ-কে ট-বর্গের ও ন-কে ত-বর্গের অন্তর্ভুক্ত করেছেন, আমি প্রত্যাশা করবো আপনি এই যুক্তি মেনে চলবেন। তাছাড়াও আপনাকে বুঝতে হবে যে, এর ব্যতয় করা কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব হয়। তারপরও যদি কেউ বলেন যে, শারীরিকভাবে উচ্চারণ করতে না পারলেও বিদেশী শব্দের বানানে মূর্ধন্য-ণ ব্যবহার করা যাবে না, তাকে আপনি কী বলবেন গোঁয়ার-গোবিন্দ ছাড়া?

অনেকে আমাকে প্রশ্ন করেছে, আমি কেনো খড়হফড়হ-এর বাংলা বানান লণ্ডন লিখি, কেনো অমুক প্রতিষ্ঠানের নিয়ম মেনে বিদেশী শব্দের বানানে মূর্ধন্য-ণ ব্যবহার করি। তাদের প্রশ্নের উত্তরে আমি বলি, দেশী হোক কিংবা বিদেশী হোক, খাবার যেমন আমি মুখ দিয়েই খাই, অন্য কোনো শারীরিক ছিদ্রপথে নয়, একইভাবে শব্দটি দেশীই হোক আর বিদেশীই হোক, এর উচ্চারণ যদি জিভ দিয়ে মূর্ধা বা তালু স্পর্শ করেই করতে হয়, আমাকে তার প্রতি বিশ্বস্ত থেকে মূর্ধন্য-ণ দিয়েই বানান লিখতে হবে। আনিরা বণ্টন যেমন ণ-দিয়ে লিখি, ইবহঃড়হ-ও আমাকে ণ-দিয়ে বেণ্টন লিখতে হবে। একইভাবে, ঠাণ্ডা যেমন ণ-দিয়ে লিখি, ঃবহফড়হ-ও আমাকে ণ-দিয়ে টেণ্ডন লিখতে হবে। এছাড়া আমার কোনো উপায় নেই। 

কারণ, এটি বস্তুনিষ্ঠভাবে প্রকৃতি দ্বারা নির্ধারিত, যার ব্যতয় করা আমার শুধু নয়, কারও পক্ষে সম্ভব নয়। আপনি চেষ্টা করে দেখুন, উপরের পাটির সম্মুখের দাঁতের পশ্চাৎ স্পর্শ করে দন্ত্য-ন দিয়ে ‘লন্ডন’ উচ্চারণ করতে চাইলে তা ‘লন্দন’ হয়ে যাবে, হতে বাধ্য। তাই, মূর্ধন্য-ণ লাগবেই। ভাষাতত্ত্ব বিশ্বাসের উপর প্রতিষ্ঠিত নয়, বিজ্ঞানের উপর প্রতিষ্ঠিত। ধ্বনি সংক্রান্ত যে বিজ্ঞান, তাকে ইংরেজিতে ফনোলজি (ঢ়যড়হড়ষড়মু) বলা হয়, আর ধ্বনি উচ্চারণ সংক্রান্ত যে বিজ্ঞান, তাকে বলা হয় ফনেটিক্স (ঢ়যড়হবঃরপং), ভাষা বিষয়ক যে সামগ্রিক বিজ্ঞান, তার নাম লিঙ্গুয়িস্টিক্স (ষরহমঁরংঃরপং)। আমি জানতে চাই, বিজ্ঞানের কোন যুক্তিতে  বাংলাদেশের বা পশ্চিম বাংলার পণ্ডিতেরা বিদেশী শব্দের বানানে মূর্ধন্য-ণ পরিহার করে নির্বিচারে দন্ত্য-ন ব্যবহার করতে বলেন।

পণ্ডিতদের প্রতি চ্যালিঞ্জ জানিয়ে বলছি, আপনারা উপরের যুক্তি খণ্ডন করে আপনাদের দাবীর পক্ষে যুক্তি প্রতিষ্ঠা করুন। আর, যদি তা না পারেন, আমার অনুরোধ, আমার যুক্তি মেনে নিয়ে বিদেশী-বিদ্বেষ পরিহার করে দেশী-বিদেশী নির্বিশেষ শব্দের উচ্চারণ অনুসারে এর বানানে মূর্ধন্য-ণ ও দন্ত্য-ন ব্যবহার করুন। বাংলাভাষা অমর হোক। লণ্ডন, ইংল্যাণ্ড।