প্রকাশিত: Thu, Apr 27, 2023 10:51 AM
আপডেট: Mon, Jan 26, 2026 11:02 AM

দুর্দিনের বন্ধু জাপানিদের আমন্ত্রণ লাল-সবুজের বাংলাদেশে

শরিফুল হাসান : আমি চাই জাপানিরা আবার আগের মতো করে বাংলাদেশে আসুক। সেই লেখায় যাওয়ার আগে একটা ঘটনা বলি। ১৩ বছর আগের ঘটনা। টোশহরের এক স্টেশনের কাছে হাতে ম্যাপ নিয়ে শ্রীলঙ্কার এক সাংবাদিক বন্ধুর সঙ্গে একটা ঠিকানা খুঁজছি। কাছাকাছি এসেও খুঁজে না পেয়ে একে ওকে প্রশ্ন করছি। কিন্তু বোঝাতে পারছি না। এর মধ্যেই হঠাৎ কোথা থেকে যেন উদয় হলেন মধ্যবয়সী এক ভদ্রমহিলা। কাছে এসে জানতে চাইলেন, কী খুঁজছো? গন্তব্য বলার পর তিনি অনেকটা হেঁটে পথ দেখিয়ে দিলেন। এরপর বললেন, তার খুব জরুরি কাজ আছে। যেতে হবে। এরপর তিনি প্রায় দৌড়াতে লাগলেন। প্রচণ্ড কাজের মধ্যেও বিদেশি বুঝতে পেরে তিনি যেভাবে সাহায্য করলেন তাতে ভালো লাগতে বাধ্য। নাম না জানা সেই জাপানিকেআজীবন ধন্যবাদ।


জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আমন্ত্রণে সেবার ১৫ দিনের জাপান সফর পৃথিবী সম্পর্কে নতুন ধারণা দিয়েছিলো। মনে আছে, দ্রুতগতির বুলেট ট্রেনে করে হিরোশিমা যাওয়ার পথে দলে থাকা এক সাংবাদিক তার পাসপোর্ট ভুল করে ট্রেনে ফেলে গিয়েছিলেন। এরপর তার কী দুশ্চিন্তা। কিন্তু সাথে থাকা জাপানি গাইড বললেন, চিন্তা করো না। আসলেই তার চিন্তা দূর হয়ে গিয়েছিলো। ট্রেন থেকে নামার আধঘণ্টার মধ্যে তার পাসপোর্টের হদিস পাওয়া যায়। জাপানের ফরেন প্রেস সেন্টারের যে ভবনটায় প্রতিদিন যেতে হতো, সেখানকার দারোয়ানকে দেখা যেতো রোজ সকালে সবাইকেমাথা নুইয়ে হাখে স্বাগত জানাচ্ছেন। একইরকম হাসিমুখ থাকতো রেস্তোরাঁর ওয়েটারা। প্রথম ধাক্কায় যে কারও মনে হবে, জাপানিরা এতো ভালো কেন!


জাপান নিয়ে আজ এতো কথা বলার কারণ, প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর। তার আগে মেট্টোরেল, তৃতীয় টার্মিনালসহ বহু কাজের জন্য ধন্যবাদ জাপানিদের। দেশি কিংবা বিদেপ্রতিষ্ঠানগুলো যখন নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না করে দফায় দফায় প্রকল্প ব্যয় বাড়ানোর ধান্দায় থাকে, সেখানে জাপানিরা নির্ধারিত সময়ের আগে কাজ শেষ করে অনন্য নজির স্থাপন করেছে অনেকবার। সময়ের আগে কাজ শেষ হওয়ায় অনেক টাকা সাশ্রয়ের ঘটনাও আছে।


জাপান কিন্তু আমাদের সবচেয়ে পুরনো বন্ধ। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সূচনালগ্ন থেকেই বাংলাদেশের শুভাকাক্সক্ষী হিসেবে পাশে আছে দেশটি। বলা যায় জাপান বাংলাদেশের দুর্দিনের বন্ধু। বাংলাদেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নে জাপানের সহায়তা নজিরবিহীন। অবকাঠামো ছাড়া কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবাসহ অন্যান্য খাতেও জাপাদের সহায়তা অনেক। বাংলাদেশকে যতো দেশ উন্নয়ন সাহায্য দেয় জাপান সেই তালিকায় সবার ওপরে। বিশেষ করে দুর্দিনে তারা সবসময় আমাদের পাশে ছিল। দুই দেশের এই সম্পর্ককে আরো এগিয়ে নিতে জাপানের প্রধানমন্ত্রী ফুমিও কিশিদার আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাপান সফরে গিয়েছেন। ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত তিনি টোকিও সফর করবেন। এই সফরে জাপানের সাথে স্বাক্ষরিত হবে আট চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক। তবে এর বাইরেও আমারএকটা বিশেষ অনুরোধ আছে। আমি খুব করে চাই ফের যেন জাপানিরা বাংলাদেশে ভ্রমণে আসে। আর সেটি নিশ্চিত করতে এই সফরে আমাদের নীতিনির্ধারকদের কথা বলা উচিত। জাপানেরও ইতিবাচকভাবে বিষয়টি ভাবা উচিত। 


আসলে ২০১৫ সালের ৩ অক্টোবর রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার আলুটারি গ্রামে জাপানি নাগরিক কুনিও হোশিকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এরপরেই জাপানিদের ভ্রমণে সতর্কতা জারি করা হয়। ২০১৬ সালের হোলি আর্টিজান ঘটনার পর এই নিষেধাজ্ঞা অনেকটা স্থায়ী হয়ে যায়। অনেকেই জানবেন, বাংলাদেশে যে দেশগুলো থেকে সবচেয়ে বেশি বিদেশি পর্যটক আসেন, সেই শীর্ষ দেশগুলোর একটি ছিলো জাপান। প্রতি বছর গড়ে হাজার বিশেক জাপানি আসতেন যার মধ্যে অসংখ্য তরুণ-তরুণী ছিলেন। কিন্তু ২০১৬ সালের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার পর থেকে সেটি বন্ধ রয়েছে।


আগেই লিখেছি, এই সফরে জাপানের সঙ্গে আট চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হবে। বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে চাওয়া, চুক্তির বাইরেও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জাপানিদের যেন এই বার্তা দেওয়া হয় যে তোমরা ফের বেশি বেশি বাংলাদেশে বেড়াতে আসো। তোমাদের আমরা স্বাগত জানাবো। আমি মনে করি পৃথিবীর এই দুঃসময়ে নীতিনৈতিকতা, আদর্শ, অপরকে সম্মান করাসহ নানা বিষয়ে জাপানিদের কাছ থেকে শেখার আছে বহু কিছু। কাজেই আমাদের দুর্দিনের বন্ধু জাপানিদের আমন্ত্রণ লাল সবুজের এই বাংলাদেশে। লেখক: অভিবাসন কর্মসূচি প্রধান, ব্র্যাক