প্রকাশিত: Thu, Apr 27, 2023 1:51 PM
আপডেট: Mon, Jan 26, 2026 11:02 AM

‘ডক্টার’ বুঝাতে ড-দশমিক (ড.) লেখা বন্ধ করুন

মাসুদ রানা : ইংরেজিতে উড়পঃড়ৎ শব্দ যখন নাউন বা বিশেষ্য, তখন এর দুটো অর্থঃ [১] যাঁর মেডিক্যাল ডিগ্রী আছে এবং অসুস্থ বা আহদের সেবা করা যাঁর কাজ [২] যিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রী পিএইচডি করেছেন। উপরের দুই অর্থেই এর সংক্ষেপিত রূপ হচ্ছে ‘উৎ’, এবং উভয়ের উচ্চারণ হচ্ছে /ˈফɒশ.ঃəৎ/। বাংলায় এই উচ্চারণ লিখলে, লিখতে হবে ‘ডক্’। বাংলায় ইংরেজ ঔপনিবেশিক এই শব্দটির প্রবর্তন-কালে এর বঙ্গীয়করণ প্রক্রিয়ায় এটি ‘ডাক্তার’ রূপ পরিগ্রহ করে, যেমনি ‘হসপিট্যাল’ শব্দের বঙ্গীয় রূপ  হয়েছে ‘হাসপাতাল’।

দীর্ঘকাল ধরে লক্ষ করছি, বাংলাদেশে চিকিৎসকদের বলা হচ্ছে ‘ডাক্তার’ আর বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রীধারীকে বলা হচ্ছে ‘ডক্টর’। কেনো? একই ইংরেজি শব্দের দু’রকমের বাংলা বানান ও উচ্চারণ কেনো?

ডাক্তার ও ডক্টর যদি হসপিট্যাল ও হাসপাতাল শব্দ দুটোর মতো আন্তঃপরিবর্তনীয়ভাবে (রহঃবৎপযধহমবধনষু) ব্যবহৃত হয়, তাতে দোষের কিছু নেই। কিন্তু একই উড়পঃড়ৎ কে কারও বেলায় ‘ডক্টর’ এবং কারও বেলায় ‘ডাক্তার’ বলা একটি অর্বাচীনতা। অর্বাচীন এই বৈষম্যমূলক উচ্চারণ তো যেমন-তেমন, কিন্তু এর চর্চিত লেখ্যরূপ একটি ফাতরামি। এই বৈষম্যমূলক লেখ্যরূপ দুটো কী কী এবং কেনো এটি ফাতরামি, তা নীচে লিখছি।

উৎ ঔধসধষ ঐড়ংংধরহ যখন একজন চিকিৎসক, তখন তার নাম বাংলায় লিখা হচ্ছে ‘ডাঃ জামাল হোসেন’। আর, উৎ কধসধষ ঐড়ংংধরহ যখন পিএইচডি ডিগ্রীধারী, তখন তাকে নির্দেশ করা হচ্ছে ‘ড. কামাল হোসেন’ লিখে। উপরের দ্বিতীয় নামের শুরুতে যে ‘ড’ বর্ণের পর দশমিক বিন্দু দেয়া হচ্ছে, এটিই হচ্ছে ফাতরামি। কারণ, ইংরেজিতে ডট শব্দ সংক্ষেপনে যে-বিন্দু ব্যবহৃত হয়, তা বাংলা দাঁড়ি (।) চিহ্নের ইংরেজি রূপ (.), যা বাংলায় গ্রহণীয় নয়। 

বাংলায় ডটের স্বতন্ত্র ব্যবহার হয় সংখ্যার ভেতরে অংকের সঙ্গে, যাকে ইংরেজিতে ‘ডেসিমাল পয়েণ্ট’ বা ‘পয়েণ্ট’ এবং বাংলায় ‘দশমিক বিন্দু’  বা ‘দশমিক’ বলা হয়। বাংলা বর্ণমালায় নীচের পাঁচ বর্ণের সঙ্গে গ্রথিত ছাড়া স্বতন্ত্রভাবে বিন্দুর ব্যবহার নেই। ব-বিন্দু র/ড-বিন্দু ড়/ঢ-বিন্দু ঢ়/অন্তঃস্থ য়/চন্দ্রবিন্দু ঁ। বাংলায় ‘দুই দশমিক পাঁচ’ (২.৫) দিয়ে আড়াই বুঝালেও ‘ড দশমিক’ (ড.) দিয়ে ড় (ড-বিন্দু ড়) বুঝার ঝুঁকি আছে। স্পষ্টতঃ বাংলা বর্ণমালায় বিন্দুর সংযুক্তি বর্ণের ধ্বনিতে মৌলিক পরিবর্তন আনে। সুতরাং উড়পঃড়ৎ বুঝাতে বাংলায় ‘ড.’ লিখা একটি অর্বাচীন ফাতরামি ছাড়া আর কিছুই নয়। 

বাঙালি কবি শামসুর রাহমান তাঁর প্রিয় বাংলাভাষার বর্ণমালাকে ‘আমার দুঃখিনী বর্ণমালা’ সম্বোধন করে লিখা কবিতার শেষ স্তবকে লিখেছিলেনঃ

‘এখন তোমাকে নিয়ে খেঙরার নোংরামি, এখন তোমাকে ঘিরে খিস্তি-খেউড়ের পৌষমাস। তোমার মুখের দিকে আজ আর যায় না তাকানো, বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা’। আমি কবি শামসুর রাহমানের দুঃখিনী বর্ণমালার দোহাই দিয়ে বাঙালি জাতি তথা বাংলাভাষী মানুষের প্রতি অনুরোধ করছি, আপনারা বাংলা বর্ণমালাকে রক্ষা করুণ। কতিপয় অর্বাচীনের ফাতরামিতে বিভ্রান্ত না হয়ে, ‘ডক্টার’ বুঝাতে ‘ড দশমিক’ (ড.) লিখা বন্ধ করুণ। ডঃ বা ডাঃ লিখা অব্যাহত রাখুন। ২৬/০৪/২০২৩। লণ্ডন, ইংল্যাণ্ড।