প্রকাশিত: Tue, Dec 12, 2023 8:48 PM
আপডেট: Mon, Jan 26, 2026 4:49 AM

জয়তু শিল্প

আহসান হাবিব  : [১] মানুষ আসলে বাস করে শিল্পে। শিল্প ছাড়া মানুষ এক সেকেন্ড থাকতে পারে না। যারা শিল্পবিরোধী তারা ঠিক মানুষ পদবাচ্য নয়। আর সব প্রাণী থেকে মানুষকে মানুষ হয়ে ওঠার জন্য যে শর্তটি তার বৈশিষ্ট্যে যুক্ত হয়েছিল, তা এই শিল্প এবং শিল্পবোধ। মানুষ যখন প্রথম হাতিয়ার বানাতে শিখলো কিংবা প্রকৃতির কোনো বস্তুকে নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করতে শিখলো, তখনই সে মানুষ হয়ে ওঠার পথে প্রথম পা রাখলো। যখন সে দেখলো প্রকৃতির কোনো বস্তু দিয়ে তার আরাধ্য কাজটি করা যায়, তখন তার প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়ালো প্রকৃতির চেয়েও উন্নত কিছু বানানো যা দিয়ে সে তার প্রয়োজনটিকে ভালোভাবে করতে পারে। একটি পাথরখণ্ড যা পারে, একটি ধারালো পাথরখণ্ড তার চেয়েও লক্ষ্যভেদী কিংবা একটা লৌহদণ্ডের চেয়ে ছুরি বেশি কার্যকর। একটি শস্যকে কী করে পুনরুৎপাদন করা যায়, মানুষের প্রথম এই চিন্তা এবং তা কার্যকর করাই ছিল তার শিল্পের সিঁড়িতে পা রাখা। এরপরের ইতিহাস কেবলি এগিয়ে চলার। মানুষ তার জীবনকে আনন্দময় করতে যা করেছে, সবই শিল্প। একজন কৃষক যখন ফসল ফলায় তখন তার মাথায় শুধু ক্ষুধা নিবারণের চিন্তা থাকে না, ফসল ফলাবার যে আনন্দ তা থাকে তার সমস্ত মনঃপ্রাণ জুড়ে। এই যে আনন্দের বোধ এটাই শিল্পবোধ।

প্রাথমিক শিল্পবোধ থেকে মানুষ তার অসাধারণ সৃষ্টিশীল মস্তিষ্কের গুণে আজ যেখানে এসে পৌঁছেছে, তার রূপ এতো বিস্ময়কর এবং সৌন্দর্যময় যে ভাবলে এক অনির্বচনীয় বোধ জাগে। প্রকৃতির সামান্য আর দশটা প্রাণীর মতোই একটি প্রাণী কি করে সেই প্রকৃতিরই প্রভু হয়ে উঠেছে, ভাবতে গেলে যে কারণটি আমরা পাই তা হলো তার অসীম সৃজনপ্রতিভা। এই সৃজনপ্রতিভার ফল হচ্ছে শিল্প নির্মাণ। প্রথমে সে থাকার জন্য কোনোরকমে একটা পাতার ছাউনি বানিয়েছে, আজ সেই মানুষ শুধু বাস করার জন্য যে প্রাসাদ বানিয়েছে, তার স্থাপত্যশৈলী দেখলে মাথা ঘুরে। আনন্দ এবং বিস্ময় জাগে। তবে সবকিছুই শিল্প সমন্বিত নয়। মানুষ যখন তার নিজ স্বার্থে কিছু করেছে, তখনই তা শিল্পবিরোধী হয়ে উঠেছে। সৌন্দর্যবিরোধী হয়ে উঠেছে। মানুষ যখন মানুষকে দাস বানিয়েছে, তখন শিল্পবিরোধী হয়ে উঠেছে, ধর্মের নামে মানুষ যখন মানুষকে কুসংস্কার আর নিজেদের কব্জায় বন্দী করতে চেয়েছে, তখন তা শিল্পবিরোধী হয়ে উঠেছে। ইতিহাস তাই বলছে ধর্ম সমস্ত সৌন্দর্যবিরোধী, শিল্পবিরোধী। পুঁজিবাদে শোষণের যে রূপ, তা জঘন্য এবং এজন্যই তা সৌন্দর্যবিরোধী যদিও সে নিজে শিল্পের স্রষ্টা। স্রষ্টা যখন তার নিজের জন্যই স্ববিরোধী হয়ে ওঠে, তখন তা বিনাশের দিকেই যাত্রা করে এবং তার বিনাশ অবিশ্যম্ভাবী। এসব অসুন্দর যখন বিলুপ্ত করে মানুষ এমন একটি সমাজ নির্মাণ করবে যেখানে প্রতিটি মানুষ নিজের সৃষ্ট শিল্পকে উপভোগ করতে পারবে, তখনই পৃথিবীটা প্রকৃত সুন্দর হয়ে উঠবে।

[২] মানুষের সৃজনশীলতা কতো ব্যাপক, গভীর এবং কল্পনাশ্রয়ী হয়ে সৌন্দর্যের রূপপ্রকাশী হতে পারে, এই ভাস্কর্যটি দেখলেই টের পাওয়া যায়। এটি একটি উদাহরণ মাত্র। এমন সৌন্দর্যময় অসাধারণ অনির্বচনীয় আনন্দে ভরপুর শিল্পে ঠাঁসা মানুষ নামের প্রজাতিটির জার্নি। এই যে সৃজনপ্রতিভা তা কেবল মানুষই অর্জন করতে পেরেছে। এই সৃজনে যে আনন্দ, তার টিকে থাকার অন্যতম প্রধান কারণ এটিই। মানুষ যদি পুনরুৎপাদন করতে না পারতো, কবেই শেষ হয়ে যেতো। আর একটি শেষ হতো আর তা হলো তার জীবনে শিল্পসৃষ্টির আনন্দ না থাকতো। লেখক: ঔপন্যাসিক